আমার নিরাপত্তার প্রয়োজন নেই : ড. কামাল

553

নিরাপত্তা দেয়ার প্রস্তাব নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে মতিঝিল চেম্বারে সাক্ষাৎ করেছেন পুলিশের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় মতিঝিল জোনের ডিসি আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশের একটি প্রতিনিধি দল তার সঙ্গে সাক্ষাতে যান। এ সময় তারা ড. কামাল হোসেনকে পুলিশি নিরাপত্তা দেয়ার প্রস্তাব দেন। পুলিশের এ প্রস্তাবে ড. কামাল জানিয়েছেন তার নিরাপত্তা লাগবে না। নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্টের যেসব প্রার্থী এবং নেতাকর্মী হামলার শিকার হচ্ছেন তাদের যেন নিরাপত্তা দেয়া হয়। পুলিশের প্রতিনিধি দলে ছিলেন- মতিঝিলের ডিসি আনোয়ার হোসেন, ডিসি (ট্রাফিক) কামরুজ্জামান, এডিসি সরোয়ার, এডিসি নাজমুন নাহার, এসি মিশু, এসি ফারুখ। ১টা ২০ মিনিটের দিকে পুলিশ কর্মকর্তারা বের হয়ে আসেন। এ সময় পুলিশের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মতিঝিল জোনের ডিসি আনোয়ার হোসেন।

তিনি বলেন, আমরা নিয়মিত ডিউটির অংশ হিসেবে ড. কামাল হোসেনের চেম্বারে এসেছিলাম। তার নিরাপত্তার ব্যাপারে কথা হয়েছে। ডিএমপি কমিশনার ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাতে আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অন্য একটি প্রোগ্রাম থাকায় তিনি আসতে পারেননি। ডিএমপি কমিশনার নিজে ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাওয়ায় তিনি ধন্যবাদ জানিয়েছেন। আমরা এটি ড. কামাল হোসেনের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেব। পরে গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসিন মন্টু বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে ড. কামাল হোসেনকে বলা হয়েছে আপনার নিরাপত্তা লাগবে কিনা? তিনি জানিয়েছেন, আমি এখনো সুস্থ আছি। আমার নিরাপত্তার দরকার নেই। যদি আপনাদের পক্ষ থেকে নিজেরাই নিরাপত্তা দেন তাতে আপত্তি নেই। এছাড়া যেখানে প্রার্থীদের ওপর হামলা হচ্ছে সেখানে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করুন। ডিএমপি কমিশনার ঐক্যফ্রন্টের নেতার চেম্বারে আসতে চাওয়া ও পুলিশ সদস্যদের সাক্ষাতের জন্য ধন্যবাদ জানান ড. কামাল হোসেন।
পরে চেম্বারে কয়েকজন সংবাদিকের সঙ্গে আলাপকালে ড. কামাল হোসেন বলেন- সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কারো খেয়ালখুশির বিষয় নয়। সুষ্ঠু নির্বাচন কোনো দাবি নয়। সংবিধানই এটা নিশ্চিত করেছে। এখন যেভাবে পাইকারি হারে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, এটা অস্বাভাবিক পর্যায়ে চলে গেছে। তাদের কার্যকলাপে আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কিত। ড. কামাল বলেন, ডিএমপি কমিশনারের সঙ্গে আমার ফোনে কথা হয়েছে। তিনি বলেছেন, আমার নিরাপত্তা নিয়ে পুলিশ উদ্বিগ্ন। আমি তাদের বলেছি, আমার নিরাপত্তার প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, পুলিশ সম্পর্কে আমার বক্তব্য নিয়ে ভুল বুঝাবোঝি হয়েছে। অতীতে যদি দেখেন, আমি সব সময়ই পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশংসা করেছি। ’৭১ সালে ২৫শে মার্চ রাতে রাজারবাগে কীভাবে পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়েছে। আশা করি তারা এখনো দেশের জনগণের পক্ষে থাকবে। তা নাহলে পুলিশের বড় বদনাম হয়ে যাবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভোটের আর মাত্র ৩ দিন বাকি। এখনো ধানের শীষের প্রার্থীদের ধরপাকড় চলছে। তাই সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে আমরা অবশ্যই শঙ্কিত। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে থাকবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন আমাদের অধিকার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যদি আমাদের এই অধিকার অর্জন অসম্ভব করে দেয়, ভোটে কোনো অনিয়ম হয় তাহলে জনগণকে সঙ্গে নিয়েই রুখে দাঁড়ানো হবে। প্রার্থিতা বাতিল হওয়া আসনগুলোতে কাউকে সমর্থন দেয়া হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে গণফোরামের কার্যকরী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, ইতিমধ্যে ৩ আসনে গণফোরামের প্রার্থীকে সমর্থন দেয়া হয়েছে। আরো যাচাই-বাছাই চলছে, হয়তো সমর্থন দেয়া হতে পারে।
ঐক্যফ্রন্টকে নির্বাচন থেকে সরাতে ইসি-সরকার সবই করছে:
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের নির্বাচনের মাঠ থেকে সরাতে নির্বাচন কমিশন-ইসি ও সরকার সব ব্যবস্থা সম্পন্ন করেছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন। গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় ঐক্যফ্রন্টের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ড. কামালের লিখিত বক্তব্য পাঠ করে এ অভিযোগ করেন ঐক্যফ্রন্টের সমন্বয় কমিটির প্রধান গণফোরামের কেন্দ্রীয় নেতা জগলুল হায়দার আফ্রিক। তিনি বলেন, ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে প্রশাসন, আইন-আদালত, পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসী বাহিনী, সর্বোপরি নির্বাচন কমিশন কাজ করছে। ধারাবাহিকভাবে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকা হামলা-মামলা, গ্রেপ্তার ও প্রার্থীদের ওপর নৃশংস হামলা জনমনে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, নীলনকশার নির্বাচনে ভোট কারচুপির সংবাদ যেন গণমাধ্যমে না আসে, সে জন্য পরিকল্পিতভাবে নানা ধরনের বাধা সৃষ্টি করছে নির্বাচন কমিশন। সাংবাদিকদের মোটরসাইকেল ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা, একই সঙ্গে একাধিক মিডিয়ার সাংবাদিক একই ভোটকক্ষে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থেকে ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণ, সরাসরি সম্প্রচার করা যাবে না এমন নীতিমালা জারির মাধ্যমে মূলত মুক্ত ও স্বাধীন গণমাধ্যমকে গলাটিপে হত্যা করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এসব বাধানিষেধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করছে যে, নির্বাচন কমিশন গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করে ক্ষমতাসীনদের নীলনকশা বাস্তবায়নের অপচেষ্টায় লিপ্ত। তিনি আরো বলেন, নির্বাচনের দিন ইন্টারনেটের গতি কমানোর জন্য ফোর জি থেকে নেটওয়ার্ক টু জিতে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এতে ভোটকেন্দ্রে সংঘটিত নানা রকম ঘটনার সংবাদ মিডিয়ায় দ্রুত আসার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। তিনি বলেন, এই অবস্থায় ঐক্যফ্রন্টের ভরসা এ দেশের জনগণ তথা ভোটাররা। যারা অতীতে কোনোদিন ভুল করেনি, তারা এবারও ভুল করবে না। সব ভয়-শঙ্কাকে জয় করে ঐক্যবদ্ধভাবে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে এদেশের সংগ্রামী মানুষ আগামী ৩০শে ডিসেম্বর ভোটযুদ্ধ সব আগ্রাসনকে মোকাবিলা করে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে। গণতন্ত্রের মুক্তির জন্য, দেশের মালিকানা জনগণ ফিরে পাওয়ার জন্য এবং আমাদের স্বাধীনতাকে অর্থবহ কার লক্ষ্যে তারা এ কাজ করবে।
গণফোরামের কার্যকরী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, আমার কাছে মনে হয়েছে হামলা-মামলা তো আছেই, পুরো বাংলাদেশকে একটা কারাগারে পরিণত করেছে সরকার। এই কারাগারের মধ্যে সকলে বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মী। গত কয়েক সাপ্তাহে আমার নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-৬ আসন থেকে তিনশ’ নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল না। নতুন নতুন মামলা দিয়ে তাদের জামিনও বন্ধ করে রেখেছে। এখনো পর্যন্ত আমাদের কর্মীরা মাঠে নামতে পারেনি। যখনই নামে বিড়ালছানার মতো ধরে নিয়ে যায়। ঢাকাসহ সারা দেশের অবস্থা দেখে আমাদের মনে হচ্ছে একটা রক্তক্ষয়ী নির্বাচনের দিকে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। সরকার ও নির্বাচন কমিশন কেন এই অবস্থা সৃষ্টি করলো আমাদের কাছে আজকে বড় প্রশ্ন। সুব্রত চৌধুরী দাবি করে বলেন, দেশের ৯০ ভাগ ভোটার আজকে ধানের শীষে ভোট দেয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। ৩০ তারিখ যদি তারা ভোটকেন্দ্রে যেতে পারে বাংলাদেশে একটা নীরব ভোট বিপ্লব হয়ে যাবে। আমি সরকারকে বলবো, মাথা ঠাণ্ডা রেখে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ যাতে তার স্বাধীনতা, গণতন্ত্র রক্ষা হয় সেজন্য কাজ করে। শুধুমাত্র ক্ষমতায় থাকার জন্য জনগণকে আর যেন প্রতারিত করে।
গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু বলেন, সারা দেশে ব্যাপক সহিংসতায় নির্বাচনী পরিস্থিতি ভয়াবহ। আসলে পরিস্থিতি এতো ভয়াবহ যে ভাষায় বুঝাতে পারবো না। তিনি বলেন, আজকেও আমার নির্বাচনী এলাকায় (ঢাকা-৭) আমরা প্রচারণার সময় কর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রেসিডেন্টের এলাকা থেকে ধানের শীষের প্রার্থী ফজলুর রহমান আমাকে জানিয়েছেন, পুলিশ বলে দিয়েছে আপনারা এলাকা থেকে বেরিয়ে যান। না হলে পরিণতি ভালো হবে না। সংবাদ সম্মেলনে সারা দেশে ধানের শীষের প্রার্থীদের ওপর ক্ষমতাসীন দল ও পুলিশি হামলা, মামলা, নির্বাচনী প্রচারের বাধা প্রদানসহ সহিংস ঘটনার চিত্র তুলে ধরেন ঐক্যফ্রন্টের সমন্বয় কমিটির প্রধান গণফোরাম নেতা জগলুল হায়দার আফ্রিক।
সংবাদ সম্মেলনে বিকল্প ধারার চেয়ারম্যান নুরুল আমিন ব্যাপারী, সাধারণ সম্পাদক শাহ আহমেদ বাদল, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, ঐক্যফ্রন্ট নেতা অর্পণা রায়, গণফোরামের মোশতাক আহমেদ, রফিকুল ইসলাম পথিক, গণদলের গোলাম মওলা চৌধুরী, মানবাধিকার সংস্থার অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শাহজাহান, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার নুরুল হুদা মিলু চৌধুরী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।