বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়ে পেশ হলো বাংলাদেশের নতুন বাজেট

193

বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির মধ্যে দিয়ে পেশ হলো বাংলাদেশের নতুন বাজেট। আসন্ন ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য অনেকটা ভারসাম্যের এক বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। অনুদান ছাড়া বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি দাঁড়াবে এক লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। বিশাল এই ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে ৪৭ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্রসহ ব্যাংক বর্হিভুত খাত থেকে আরও ৩০ হাজার কোটি টাকা সংস্থানের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। পুরো বাজেটেই ভারস্যাম প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন অর্থমন্ত্রী। ব্যক্তি পর্যায়ে করসীমা আগেরটাই বহাল রাখা হয়েছে। তবে করদাতার সংখ্যা আরও বাড়ানোর লক্ষ্য ধরা হয়েছে। নতুন বাজেটে প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ২ ভাগ এবং মূল্যস্ফিতি ৫.৫ এ ধরে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বড় ঘাটতির মেগা এই বাজেটকে অর্থনীতিবিদরা গতানুগতিক বাজেট বলে আখ্যা দিয়েছেন।

তারা বলছেন, অনেকটা পুরনো ধাচের এই বাজেটে ব্যক্তি খাতের প্রসারে কোন সুখবর নেই।

অর্থমন্ত্রী তার বক্তৃতায় প্রস্তাবিত বাজেটকে অনেকটা চ্যালেঞ্জের বলে উল্লেখ করেছেন। অর্থনীতিবিদরাও এই বাজেট বাস্তবায়নে সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ দেখছেন। অর্থমন্ত্রী কর আহরণ প্রক্রিয়ায় অনেকটা সহনশীল অবস্থান প্রকাশ করে ব্যক্তি পর্যায়ের কর সীমা বহাল এবং নতুন কর আহরণে ভারসাম্যের নীতি নিয়েছেন। তিনি তার বক্তৃতায় ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই এর অর্থমন্ত্রীর একটি উক্তি উদ্বৃত করে করনীতির অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। রাজা লুই এর অর্থমন্ত্রীর উক্তিটি ছিল এরকম ‘ রাজহাঁস থেকে পালক উঠাও যতোটা সম্ভব ততোটা, তবে সাবধান রাজহাঁসটি যেন কোনভাবেই ব্যাথা না পায়’। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ কৌশলে রাজস্ব আহরণ কতোটা সহজ হবে তা সময়ই বলে দেবে।

নতুন অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত এই ব্যয় বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের ১৮ শতাংশ বেশি। বৃহস্পতিবার বিকালে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের এই বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। তার আগে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর ওই প্রস্তাবে সই করেন প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ। যদিও অর্থমন্ত্রীর অসুস্থতার কারণে তার বাজেট বক্তৃতার শেষ অংশ উপস্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সংসদীয় ইতিহাসে এটি এক বিরল ঘটনা। এবার সোয়া পাঁচ লাখ কোটি টাকার বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হচ্ছে ২ লাখ ১১ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত উন্নয়ন বাজেটের প্রায় ২২ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার দুই লাখ দুই হাজার ৭২১ কোটি টাকা। এবার পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে তিন লাখ ১০ হাজার ২৬২ কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত অনুন্নয়ন বাজেটের চেয়ে ১৬ শতাংশের বেশি।

এর মধ্যে ৬০ হাজার ১০৯ কোটি টাকা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধেই যাবে, যা মোট অনুন্নয়ন ব্যয়ের ১৯ শতাংশের বেশি। প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব খাতে আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। এই অংক বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের ১৯ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে কর হিসেবে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা আদায় করা যাবে বলে আশা করছেন অর্থমন্ত্রী। ফলে এনবিআরের কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে ১৬.২৮ শতাংশ। গতবারের মত এবারও সবচেয়ে বেশি কর আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট থেকে, এক লাখ ২৩ হাজার ৬৭ কোটি টাকা। এই অংক বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৭.২১ শতাংশের মত। বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাট থেকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা ছিল ১ লাখ ১০ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা। লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১ লাখ ৪ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়।

আয়কর ও মুনাফার উপর কর থেকে ১ লাখ ১৩ হাজার ৯১২ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার আশা করা হয়েছে এবারের বাজেটে। বিদায়ী সংশোধিত বাজেটে এর পরিমাণ ছিল ৯৫ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা। এছাড়া নতুন বাজেটে আমদানি শুল্ক থেকে ৩৬ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা, সম্পূরক শুল্ক থেকে ৪৮ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা, রপ্তানি শুল্ক থেকে ৫৪ কোটি টাকা, আবগারি শুল্ক থেকে ২ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা এবং অন্যান্য কর ও শুল্ক থেকে ১ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করেছেন অর্থমন্ত্রী। এছাড়া বৈদেশিক অনুদান থেকে ৪ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা পাওয়া যাবে বলে বাজেট প্রস্তাবে আশা প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী। বাজেটে আয় ও ব্যয়ের হিসাবে সামগ্রিক ঘাটতি থাকছে প্রায় এক লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৫ শতাংশের সমান। এই ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক ঋণ থেকে অর্থ সংস্থানের লক্ষ্য রয়েছে। এর মধ্যে বিদেশ থেকে ৬৩ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ খাত থেকে ৭৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা ঋণ করে ওই ঘাটতি মেটানোর আশা করা হচ্ছে।

নতুন বাজেটে ভ্যাটের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি নিত্য ব্যবহার্য কিছু পণ্যের ভ্যাট হার বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে এসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে। নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সিগারেট, বিড়ি, জর্দা ও গুলের দাম বাড়ানো হচ্ছে। শুল্ক বাড়ানোর কারণে বাড়তে পারে মোবাইল ফোনে কথা বলার খরচ। একই সঙ্গে স্মার্ট ফোনের শুল্ক বাড়ানোর কারণে এটির দামও বাড়বে। রড উৎপাদন ও বিপণনে ভ্যাট বাড়ানোর প্রস্তাব করায় বাড়ি করার খরচ বাড়তে পারে। উৎপাদন পর্যায়ে ট্যারিফ মূল্যের পরিবর্তে ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করায় এলপি গ্যাস, আমদানি করা গুঁড়া দুধ, গুঁড়া মসলা, টমেটো কেচাপ, চাটনি, ফলের জুস, টয়লেট টিস্যু, টিউবলাইট, চশমার ফ্রেমের দাম বাড়তে পারে। একই কারণে দাম বাড়তে পারে প্লাস্টিকের তৈরি গৃহস্থালি সামগ্রী, সিআর কয়েল, জিআই ওয়্যার, তারকাঁটা, স্ক্রু, অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি হাঁড়ি-পাতিল, থালা-বাসনসহ গৃহস্থালি সামগ্রী, ব্লেড, ট্টান্সফরমার, সানগ্লাস, রিডিং গ্লাসের। আইসক্রিমের ওপর ৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

তাই আইসক্রিমের দামও বাড়তে পারে। এ বাজেটে সয়াবিন, পাম অয়েল, সূর্যমুখী ও সরিষার তেলের উপর স্থানীয় ও আমদানি পর্যায়ের ওপর শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। যদিও দীর্ঘদিন ধরে সয়াবিন, পাম অয়েল, সূর্যমুখী ও সরিষার তেল শুল্ক অব্যাহতি পেয়ে আসছিল। সয়াবিন, পামঅয়েল, সূর্যমুখী ও সরিষার তেলের উপর স্থানীয় ও আমদানি শুল্ক আরোপ করা করায় এসব পণ্যের দাম বাড়বে। টিভি ও অনলাইনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান সরবরাহকারী, স্থানীয় পর্যায়ে জ্যোতিষী ও ঘটকালিতে মূসক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। পুঁজি বাজারের বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ আয়ের করমুক্ত সীমা ২৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। বাজেটে জ্যোতিষি ও বিয়ের ঘটকদের ওপর কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের কর সুবিধা দিতে বার্ষিক ৫০ লাখ টাকার বেশি টার্নওভার হয় এমন ব্যবসায়ীদের ওপরই কেবল মূল্য সংযোজন কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এদিকে দাম কমতে পারে এমন পন্যের মধ্যে আছে ক্যানসার প্রতিরোধক ওষুধ উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল। এসব কাঁচামালের কর অব্যাহতি সুবিধা দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায় ব্যবহৃত উপকরণের শুল্ক কমানো হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। এছাড়া পাউরুটি, বনরুটি, হাতে তৈরি কেক প্রতি কেজি ১৫০ টাকা পর্যন্ত মূসক অব্যাহতি দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে।এছাড়া দাম কমতে পারে দেশে উৎপাদন হয় এমন মোটরবাইকের। কৃষি যন্ত্রপাতি পাওয়ার রিপার, পাওয়ার টিলার অপারেটেড সিডার, কম্বাইন্ড হারভেস্টর, লোরোটারী টিলার, লিস্ট পাম্পের স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে মূসক অব্যাহতি দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এতে এসবের দাম কমতে পারে। এছাড়া পাদুকা সামগ্রির দামও কমতে পারে। বিদেশ থেকে আমদানি করা স্বর্ণের দাম কমতে পারে।
এদিকে আজ বিকালে বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে আসছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অর্থমন্ত্রী অসুস্থ থাকায় বিকা তিনটায় রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন হবে বলে তার প্রেস উইং সূত্র জানিয়েছে। সূত্র ও সৌজন্যে : বিবিসি বাংলা