পারমাণবিক হামলা হলে আত্মরক্ষার্থে কী করবেন?

66

একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে. ট্রাম্প, অন্যদিকে নর্থ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জন উন। এই দুই ব্যক্তিই বর্তমান বিশ্বকে গরম রেখেছে বিগত কয়েক মাস ধরে। আক্রমণের হুমকি-পাল্টা হুমকির পরে এখন দেয়া হচ্ছে ‘পারমাণবিক হামলা’র হুমকিও। নর্থ কোরিয়া দাবি করেছে, মাত্র তিনটি বোমা দিয়ে তারা পুরো পৃথিবীকে উড়িয়ে দেবে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাত হাজারের বেশি পারমাণবিক বোমা ও অস্ত্র-শস্ত্র রয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়ার কাছে রয়েছে পৃথিবীর সব থেকে শক্তিশালী হাইড্রোজেন বোমা ‘জার’। এই ‘জার’ হাইড্রোজেন বোমাই পৃথিবীতে মানবসৃষ্ট এখন পর্যন্ত সব থেকে শক্তিশালী। বর্তমানে বিশ্বে নয়টি দেশের কাছে মোট ১০ হাজার ৩০০ পারমাণবিক বোমা আছে বলে বিভিন্ন অফিসিয়ালসূত্রে জানা যায়। কিন্তু এর প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। এছাড়া গোপনে বিভিন্ন দেশে তৈরি হচ্ছে রাসায়নিক বোমা। যা দিয়ে মূহুর্তের মধ্যেই লাখ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়া সম্ভব।

সুতরাং এটি বোঝা যাচ্ছে যে, শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর কেউই কারো থেকে কম যাচ্ছে না। যুদ্ধ যদি একবার বেঁধে যায়, তাহলে সবাই তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী হামলা করতে চেষ্টা করবে। এসময় পারমাণবিক বোমার হামলাও যে হতে পারে তা খুব সহজেই অনুমেয়।

যদি আপনার শহরে পারমাণবিক বোমার হামলা হয়, তাহলে কি আপনার বেঁচে থাকার কোন সম্ভাবনা আছে? কিংবা এমন শক্তিশালী বোমার আঘাতের সময় আপনার কিভাবে আত্মরক্ষা করা উচিত?

এই প্রশ্নের উত্তর জানার আগে পারমাণবিক বোমা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা থাকা জরুরি। পারমাণবিক বোমা হচ্ছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বিশেষ এক বোমা যার ভিতরে পরিমাণ অনুযায়ী সব থেকে শক্তিশালী ও তেজস্ত্রিয় পদার্থের পরমাণু (এটম) থাকে। এই বোমা সক্রিয় হলে পরমাণুর বিভাজনের মধ্য দিয়ে বোমার শক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং তা ক্রমে বেড়েই চলে। এর ফলে সৃষ্টি হয় পরমাণু ঝড়। সাথে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ ক্ষতিকর পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তার (রেডিয়েশন)। যা প্রাণীর শরীরে ক্যান্সারসহ মারাত্মক বিপর্যযের সৃষ্টি করে।

রাশিয়ার জার বোমার ক্ষয়ক্ষতি করার ক্ষমতার চার্ট। এখানে দেখা যাচ্ছে মাত্র একটা জার বোমা দিয়েই লস এঞ্জেলস শহর উড়িয়ে দেয়া সম্ভব

১৯৪৫ সালের ৬ই আগস্টে জাপানের হিরোশিমাতে ‘লিটলবয়’ নামের পারমাণবিক বোমা ফেলে যুক্তরাষ্ট্র। এর তিনদিন পর নাগাসাকিতে ‘ফ্যাটম্যান’ নামের আরেকটি বোমা ফেলা হয়। লিটল বয়ের আঘাতে হিরোশিমাতে তাৎক্ষণিকভাবে এক লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়। বিল্ডিং, ব্রিজ, টাওয়ারসহ শক্ত পদার্থের তৈরি জিনিস প্রায় উড়ে যায়। বোমাটি যেখানে ফেলা হয়েছিলো সেখান থেকে বৃত্তাকারে ১.৬১ কিলোমিটার এলাকার সবকিছু সম্পূর্ণরুপে ধ্বংস হয়ে যায়। প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে শুধু হিরোশিমাতেই নিহত হয় দুই লাখ ২০ হাজারের বেশি মানুষ।

এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে তথ্য দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পদার্থ বিজ্ঞানী, গণিতবিদ মাইকেল ডিলন। তিনি জানিয়েছেন যদি হিরোশিমায় ফেলা বোমার থেকে কম শক্তিশালী কোন বোমা  আপনার শহরে বিস্ফোরিত হয়, তাহলে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় নেমে আসবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তা হতে পারে ০.১ কিলোটন থেকে ১০ কিলোটন পর্যন্ত। হিরোশিমার বোমাটি ছিলো ১৫ কিলোটনের।

গবেষণায় দেখা গেছে, পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের সময় যদি বুদ্ধি প্রয়োগ করে তেজস্ক্রিয়তার হাত থেকে কোনক্রমে বেঁচে থাকা যায়, তাহলে এই ধরনের বোমার আঘাতের পরেও লক্ষাধিক মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। সেক্ষেত্রে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎক্ষণিক কাজটি হচ্ছে পারমাণবিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়ার কৌশল বের করা।

পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তার হাত থেকে বাঁচতে বই, চালের বস্তা বা যেকোন শক্ত বস্তু দিয়ে চারপাশ ঘিরে রাখতে হবে

তেজস্ক্রিয় বিকিরণের বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায়

বোম বিস্ফোরণের পর বোমার ভিতরের পারমাণুর বিভাজন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সাথে সাথে ভিতরে থাকা পদার্থসমূহ থেকে তেজস্ক্রিয়তা ভূমির উপরে আড়াআড়িভাবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বোমা বিস্ফোরণের সময় শুরু হয় পারমাণবিক ঝড়। এসময় প্রচণ্ড উত্তপ্ত শক্তিশালী বাতাস প্রবাহিত হয়। বাতাসের সাথে ঝড়ো প্রবাহের মতো ছড়িয়ে পড়ে তেজস্ত্রিয়তা। তাই কোন অঞ্চলে সাধারণভাবে যেদিক দিয়ে বাতাসের গতিবেগ বেশি থাকে, সেদিকেই তেজস্ত্রিয়তা বেশি ছড়িয়ে যায় এবং বিপর্যয় বেশি ঘটে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নিউইয়র্ক শহরে পূর্ব দিকে বিপর্যয় বেশি হবে কারণ এই শহরটিতে এদিকে বাতাসের চাপ বেশি থাকে।

এই বিপর্যয় থেকে বাঁচতে সব থেকে ভালো উপায় হচ্ছে মাটির নিচে লুকানো। সেটি হতে যারে বিশেষ কোন জায়গা বা বিল্ডিংয়ের বেসমেন্ট যেটি শক্ত পদার্থ দিয়ে ঘেরা। সেখানে উদ্ধার কর্মীরা না পৌঁছানো পর্যন্ত অপেক্ষা করা।

এই ছবির স্টার চিহ্নিত জায়গাটি হচ্ছে ‘হাইপোসেন্টার’ বা যেখানে বোমাটি আঘাত করে। এর থেকে বৃত্তাকারে যতো দূরে যাওয়া যায় বোমার ক্ষতির ক্ষমতা ততো কমতে থাকে।

প্রাথমিকভাবে ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে ভবনের কেন্দ্রের দিকে বা মাঝামাঝি কোন রুমে অবস্থান নিতে হবে। সব সময় মাটির নিচের দিকে অর্থাৎ বেসমেন্টে অবস্থান নিলে রক্ষা পাবার সম্ভাবনা বেশি।

পাশের শক্তিশালী ভবনের নিচে লুকানোর পরামর্শ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীরা। তবে এভাবেও পারমাণবিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়া কঠিন হবে। যে ভবন যতো পাতলা ও হালকা বস্তু দিয়ে তৈরি, সেগুলো ততো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। যে ভবন যতো ভারি ও শক্তিশালী বস্তু দিয়ে তৈরি, সেগুলো ততো সুরক্ষিত। ভবনের বেসমেন্টে যদি কোন ছিদ্র না থাকে চারদিক থেকে বন্ধ থাকে তাহলে বেশি ভাল হবে। কেউ যদি পাঁচতলা ভবনের নিচে লুকান তাহলে বাইরের তেজস্ক্রিয়তার বিকিরণের দুইশভাগের মাত্র একভাগ তার ক্ষতি করবে।

পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণের পর তেজস্ক্রিয়তা থেকে বাঁচতে গুদাম ঘর হতে পারে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ আশ্রয়স্থল

একই সময়ে কেউ যদি কাঠের তৈরি একতলা ভবনের বসার ঘরে আশ্রয় নেন তাহলে, বাইরের বিকিরণের মাত্র অর্ধেক তাকে স্পর্শ করবে। এসব পদ্ধতি শুধু তারাই করতে পারবেন যারা বোমার রেডিয়াস অঞ্চলের বাইরে থাকবেন। কারণ রেডিয়াস অঞ্চলের মধ্যে কারও বেঁচে থাকার আর কোনো আশা থাকবে না।

বোমা বিস্ফোরণের প্রাথমিক পর্যায় শেষ হলে পরে অপেক্ষা না করে চারপাশে বই, কাঠ, বস্তা, কিংবা যে কোনো শক্ত পদার্থ দিয়ে ঘিরে ফেলতে হবে। এতে তেজস্ত্রিয়তার তীব্রতা কমবে। মাটির যতো নিচের দিকে যাওয়া যাবে ততো তেজস্ক্রিয়তার তীব্রতা কমবে। অনেক দেশে খাদ্য সংগ্রহের জন্য মাটির নিচে বা বাসার নিচে গুদাম ঘর তৈরি করা হয়। এসব জায়গাই হতে পারে পারমানবিক তেজস্ক্রিয়তা থেকে বাঁচতে সব থেকে উত্তম জায়গা।

পরিকল্পিতভাবে ভনের বেসমেন্টের জায়গা বৃদ্ধি করে পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে

বোমা বিস্ফোরণের পর বাইরে বের হতে গেলে শরীর সম্পূর্ণ ঢেকে বের হতে হবে। কারণ এসময় এক ধরণের শুষ্ক ছাই জাতীয় পদার্থ বাতাসে উড়তে পারে। এই ছাই যদি শরীরে লাগে তাহলে শরীর পুড়ে যেতে পারে। তাই বাইরে থেকে এসে ভাল করে শরীর ধুয়ে ফেলতে হবে। যতো দ্রুত সম্ভব তেজস্ক্রিয়তা বিকিরণের এলাকার ভেতর থেকে বের হয়ে যেতে হবে।

বিস্ফোরণের সময় ঘরের ভেতরে থাকবেন না বাইরে যাবেন?

২০১৪ সালের এক গবেষণায় বিজ্ঞানী মাইকেল ডিলন উত্তর বের করেছেন যে এই সময়ে কি সিদ্ধান্ত নেয়া বেশি যুক্তি-যুক্ত। কিন্তু তা নির্ভর করবে আপনি বোমার আঘাতের কেন্দ্রবিন্দু থেকে কতোটা দূরে অবস্থান করছেন তার উপর। কারণ এর উপর বিপর্যয়ের অবস্থা নির্ভর করে। ডিলন বলেছেন বোমা বিস্ফোরণের সময় শক্ত পদার্থ দিয়ে নির্মিত বিল্ডিংয়ের নিচে গিয়ে অবস্থান করতে হবে। এতে তেজস্ত্রিয়তা অপেক্ষাকৃত কম প্রভাব ফেলবে।

কাঠের ঘরে থাকলে যতক্ষণ সম্ভব ঘরের ভিতরে অবস্থান করতে হবে। ঘরের নিচে বেসমেন্ট থাকলে সেখানে গিয়ে অবস্থান করতে হবে

যারা অপেক্ষাকৃত কম শক্ত পদার্থ দিয়ে নির্মিত ভবনে থাকবেন তারা তাৎক্ষণিকভাবে বাইরে না বেরিয়ে বাসার নিচের দিকে অবস্থান করতে পারেন। শক্ত পদার্থের ভিতরে নিজেকে লুকিয়ে ফেলার বিষয়টি সব সময় মাথায় রাখতে হবে। এই বিষয়গুলো মাথায় রাখলে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ মিলতে পারে